রাশিয়ান সাহিত্যের সঙ্গে আমার শৈশব

 


আমার শৈশব কেটেছে বইয়ের ভেতর ডুবে, আর সেই বইগুলোর এক বিশাল অংশ জুড়ে ছিল রাশিয়ান সাহিত্য। আমার আব্বুর সংগ্রহে ছিল দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়, চেখভ, গোগোল, পুশকিনসহ অসংখ্য রাশিয়ান লেখকের বই, যেগুলোর পৃষ্ঠার ভাঁজে লুকিয়ে ছিল এক অজানা জগত। সেই ছোট্টবেলায় যখন আমি গল্পের গভীরে প্রবেশ করতে শিখিনি, তখনও এই বইগুলোর ভার আমার কৌতূহলকে নাড়া দিত।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমি পড়তে শুরু করলাম তলস্তয়ের বিশাল ক্যানভাস, দস্তয়েভস্কির মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা, চেখভের সূক্ষ্ম মানবিক টানাপোড়েন। তাদের লেখা শুধু কাহিনি ছিল না, ছিল জীবনবোধ, দর্শন, সমাজের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।

তলস্তয়ের War and Peace ইতিহাসের মহাকাব্যের মতো মনে হয়েছে, নেপোলিয়নিক যুদ্ধের পটভূমিতে এক মহৎ উপন্যাস, যেখানে যুদ্ধ আর জীবনের জটিলতা একসঙ্গে মিশে গেছে। আর Anna Karenina! এ এক বিস্ময়! প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা, সামাজিক বিধিনিষেধ, ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব তলস্তয় যেন চরিত্রদের অনুভূতির প্রতিটি সূক্ষ্ম দোলাচল রঙের মতো এঁকে দিয়েছেন।

দস্তয়েভস্কির The Brothers Karamazov যখন পড়লাম, তখন মনে হলো এটা শুধু একটা উপন্যাস নয়, এটা মানুষের আত্মার এক অন্তহীন যাত্রা।তারপর এল Crime and Punishment একটা উপন্যাস, যা আমাকে নাড়া দিয়ে গেল। রাস্কলনিকভের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন, অপরাধবোধ আর নৈতিকতার দ্বন্দ্ব আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। দস্তয়েভস্কির লেখার গভীরতা, তার চরিত্রগুলোর জটিলতা আমাকে মুগ্ধ করেছিল।

আর চেখভ? তাকে তো আমি দেরিতেই পড়া শুরু করলাম, কিন্তু The Lady with the Dog আমার মনে যেন এক অন্যরকম প্রশান্তি আর বিষাদ একসঙ্গে এনে দিলো। চেখভের লেখা এত সংক্ষিপ্ত অথচ এত গভীর একটা গল্প শেষ করলেই মনে হয়, আমি যেন কিছু হারিয়ে ফেললাম। তার The Bet গল্পটাও আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল বিনোদনের বাইরে গল্প কীভাবে জীবন ও দর্শনকে তুলে ধরতে পারে, তা চেখভের লেখায় স্পষ্ট।

তবে আব্বুর সংগ্রহ শুধু সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তার সংগ্রহে ছিল লেনিন, মার্ক্স, স্টালিনের বই, সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব, বিপ্লবের ইতিহাস। আমি ছোটবেলায় হয়তো সব বুঝতে পারিনি, কিন্তু বইগুলোর উপস্থিতি আমাকে এক ধরনের রাজনৈতিক চেতনার সঙ্গে পরিচিত করেছিল। সেসব বইয়ের পাতায় লেখা ছিল মানুষের সংগ্রামের কথা, শ্রেণিসংগ্রামের তত্ত্ব, এক নতুন সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন। বড় হয়ে যখন মার্ক্স পড়লাম, লেনিনের চিন্তাভাবনা বুঝতে শুরু করলাম, তখন উপলব্ধি করলাম এই বইগুলো শুধু তত্ত্ব নয়, বরং ইতিহাস গড়ে তোলার হাতিয়ার।

এর মধ্যে ছিল নিকোলাই অস্ত্রোভস্কির How the Steel Was Tempered (ইস্পাত), যে বইটা আমার কাছে এক অনন্য অনুপ্রেরণার উৎস। পাভেল করচাগিনের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ আর অবিচল মনোবল আমাকে শেখায় জীবনে সব কিছু পাওয়া সহজ নয়, কিন্তু সত্যিকারের লক্ষ্য থাকলে অসম্ভবও সম্ভব করা যায়। আর ছিল Tanya (এর লেখক আর্চি পেরি (Archie Perri) ইংরেজি ভাষায় এটি লিখেছেন। তবে, এটি রাশিয়ান ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে লেখা একটি উপন্যাস) এক বিপ্লবী কিশোরীর জীবনগাথা, যা আমার মনে দেশপ্রেম আর আদর্শের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল।

রাশিয়ান সাহিত্য আমার কাছে শুধু বইয়ের পাতা নয়, এটি আমার শৈশবের স্মৃতি, আব্বুর বইয়ের গন্ধ, বৃষ্টি ভেজা দুপুরে হারিয়ে যাওয়ার আশ্রয়, অনেক নির্ঘুম রাতের সঙ্গী। এটা আমার অনুভূতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা আমাকে ভাবতে শিখিয়েছে, অনুভব করতে শিখিয়েছে, হয়তো একাকী হতে শিখিয়েছে, কিন্তু কখনোই নিঃসঙ্গ হতে দেয়নি।


এখনও, যখন রাশিয়ান কোনো বই হাতে নিই, মনে হয় আমি শৈশবে ফিরে গেছি, সেই বইয়ের ভেতর ডুবে থাকা ছোট্ট আমিটা যেন এখনো আমার মধ্যে বেঁচে আছে।


~ তাসনিম আহমেদ 

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫

Comments