বৃষ্টির দিন আর একশো বছরের নিসঙ্গতা

 

বৃষ্টি আর জানালা 

গতকাল থেকেই অঝোরে বৃষ্টি ঝরছে। জানালার কাঁচে জলবিন্দু জমে আছে, যেন কেউ অদৃশ্য হাত দিয়ে প্রতিটি ফোঁটা লিখে রেখেছে অজানা কোনো ভাষায়। বৃষ্টির এই অনন্ত ধারা হঠাৎ করে মনে করিয়ে দিল Gabriel García Márquez-এর অমর সৃষ্টি One Hundred Years of Solitude কে।


মাকন্দো শহরে যে নিরবচ্ছিন্ন বৃষ্টির বর্ণনা লেখক দিয়েছেন, তা যেন ঠিক আমাদের বর্ষাকালেই সত্যি হয়ে যায়। Márquez লিখেছিলেন টানা চার বছর, এগারো মাস, দুই দিন ধরে বৃষ্টি নেমেছিল মাকন্দোতে। সেই বৃষ্টি শুধু শহরকে ভিজিয়ে দেয়নি, মানুষের স্মৃতি, তাদের সম্পর্ক, এমনকি তাদের অস্তিত্বকেও ধুয়ে নিয়ে গিয়েছিল।


আজও যেন মাকন্দোর মতো সময় একটু ধীর হয়ে গেছে। রাস্তাঘাট ফাঁকা, কেবল বৃষ্টির শব্দ। চারপাশের পৃথিবীকে এই নিঃশব্দ ভিজে ছায়ার মধ্যে দাঁড় করিয়ে রেখেছে।



One Hundred Years of Solitude 



কখনও কখনও মনে হয় এই টানা বৃষ্টি আসলে আকাশের লেখা একটি অদৃশ্য পাণ্ডুলিপি, যেখানে জল দিয়ে লেখা থাকে অচেনা সত্য। কেউ পড়ে না, কেউ বোঝে না। কেবল যে বুঝতে চায়, তার চোখেই তা স্পষ্ট হয়।


One Hundred Years of Solitude-এ বৃষ্টি কেবল প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং মানুষের নিয়তি, নিসঙ্গতা, আর ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির প্রতীক। প্রতিটি চরিত্র যেন নিজের মতো করে নিসঙ্গতায় ভুগেছে প্রেমে, পরিবারে, কিংবা নিজস্ব অস্তিত্বের ভেতরে। আর সেই নিসঙ্গতার সঙ্গী ছিল প্রকৃতি..কখনো বৃষ্টি, কখনো খরা।


এই টুপটাপ শব্দে মাঝে মাঝে মনে হয় ভেতরের কোনো ভাঙন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চারপাশের কেউ কিছু টের পায় না, শুধু যে শুনতে জানে সে-ই বোঝে কিছু ফোঁটা বাইরে নামে, কিছু ফোঁটা ভেতরে ঝরে।


বৃষ্টি শান্তিরও যেমন হয় ঠিক উল্টোও মিথ্যা আর প্রতারণা মতোও হয়। প্রথমে শীতল, অচেনা আনন্দের মতো মনে হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে তা সব ভিজিয়ে ফেলে, সবকিছুকে কাদায় ডুবিয়ে দেয়। শেষে যা থাকে, তা শুধু ধ্বংসস্তূপ আর নোংরা স্রোত। বাইরের চোখে এ কেবল ভেজা পৃথিবী, অথচ ভেতরে থেকে যায় চূর্ণ-বিচূর্ণ আস্থার টুকরো।


তবুও বৃষ্টি একদিন থেমে যায়। আকাশে আলো ফোটে। নদী আবার তার স্বাভাবিক স্রোতে ফিরে আসে। হয়তো এও এক প্রতীক যত মিথ্যা বা প্রতারণাই হোক, একসময় তা ধুয়ে যাবে। সময়ের জলধারা সত্যকে টিকিয়ে রাখবে, বাকিটুকু কেবল ভেসে যাবে ভেজা ধুলোর মতো।


বৃষ্টি সবকিছুকে ভিজিয়ে দেয়, পুরনো স্মৃতিগুলোকে টেনে আনে, নতুন কাহিনি লেখে। আর সেই মুহূর্তেই Márquez-এর উপন্যাস মনে করিয়ে দেয়.....নিসঙ্গতা কখনো অভিশাপ, আবার কখনো আশ্রয়ও।


১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫

Comments

  1. পৃথিবীতে অল্প কিছু মানুষ এমন হৃদয় নিয়ে জন্মায় যারা হৃদয়ের শব্দগুলো এভাবে লিখে প্রকাশ করতে পারে। তোমাকে একদিন মানুষ খুঁজবে, তোমার লেখা খুঁজে খুঁজে পড়বে। এমন শব্দ কোনভাবেই হারিয়ে যেতে পারেনা।

    ReplyDelete
  2. তোমার লেখা পড়ার একটাই অসুবিধে জে—একবার পড়া শুরু করলে ছাড়া যায় না। আবার এতো দ্রুত শেষ হয় যা ক্ষুধা রেখে যায় আরও পড়ার।

    ReplyDelete

Post a Comment