মায়া আর জ্যোৎস্না: ইমতিয়ার শামীমের ‘অন্ধ মেয়েটি জ্যোৎস্না দেখার পর






ধরো, এক রাতে তুমি হাওরের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছো। চারদিক শাদা জ্যোৎস্নায় ধুয়ে গেছে, অথচ তোমার চোখে কিছুই নেই। শুনছো কেবল, নদীর গলা, পাখির পাখা ঝাপটানোর শব্দ, দূরের বাঁশির সুর, আর কারও নিঃশ্বাস, যেন জ্যোৎস্নার নিজেরই নিঃশ্বাস। এমন এক রাতেই বোধহয় ‘অন্ধ মেয়েটি’ দেখেছিলো জ্যোৎস্না।

না, সে চোখে দেখে না, কিন্তু তার মন দেখেছে। যেমন করে তুমি কোনো প্রিয় মানুষের অনুপস্থিতি দেখো...অপেক্ষার ঘ্রাণে, হাওয়ার শীতলতায়, কিংবা সুরের ফাঁকে। এই গল্প তেমনই এক দেখার গল্প, যা চোখ দিয়ে নয়, আত্মা দিয়ে হয়।

ইমতিয়ার শামীম এই লেখায় কেবল গল্প বলেননি, তিনি এক অদৃশ্য জানালার পর্দা সরিয়ে দিয়েছেন। সেই পর্দার ওপারে, আমরা দেখি এমন এক পৃথিবী, যেখানে স্পর্শ দিয়ে মানুষ চিনে আলো, শব্দ দিয়ে বোঝে ভালোবাসা, আর গন্ধ দিয়ে খুঁজে ফেরে পরিচিত মুখ।

গল্পের এক জায়গায় তিনি লেখেন-
"সে বলে-আমি আজ দেখেছি, যদিও আমার চোখ নেই। বাতাস কাঁপে তার কণ্ঠে। জ্যোৎস্না থমকে দাঁড়ায়। আমরা, যারা চোখে দেখি, হঠাৎ বুঝি, আমরা কিছুই দেখিনি।"

‘অন্ধ মেয়েটি জ্যোৎস্না দেখার পর’ কেবল একটি গল্প নয়, এটি যেন এক নিঃশব্দ বিপ্লব। এখানে কোনো ঘোষণা নেই, নেই উচ্চকিত বর্ণনা, তবু প্রতিটি শব্দ তীব্রভাবে উপস্থিত।

গল্পের চরিত্রগুলো যেন বাতাসে গাঁথা, অথচ মাটির গন্ধমাখা। তাদের কথা কম, অনুভব বেশি। গল্পের মায়া চরিত্রটি যেন জ্যোৎস্নার আত্মীয়, শান্ত, ধীর, অথচ অভ্যন্তরীণভাবে আলোয় ভরা।

ইমতিয়ার শামীমের গদ্য ঝর্ণার মত। কখনো ঝিরিঝিরি, কখনো একেবারে নিরব। তাঁর ভাষা এমন, যেন হাওরের কুয়াশা হাতে ধরা যায়, বা শীতের সকালে ঘুম থেকে উঠে জানলার পাশে দাঁড়ালে যে নিঃশব্দ গান বাজে সেইরকম।

একটি লাইন ছিলো এমন-
"আমরা যারা আলো নিয়ে জন্মাই, তারা বহু আলো নষ্ট করে ফেলি। সে জন্মেছে অন্ধকারে, তাই একফোঁটা আলোকেও সে পূজা করে।"

বইটা শেষ হওয়ার পর, মনে হলো যেন কেউ কানের পাশে এসে ধীরে ধীরে একটা কথা বলে গেলো, "দেখতে শিখো, বন্ধু! চোখ দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়ে।"

একটা প্রশ্নই শুধু মাথায় ঘুরছে বইটা শেষ করার পর থেকে---আমরা কী সত্যিই দেখি, নাকি কেবল চোখ খোলা রাখি?

Comments