ইসরায়েলি অত্যাচারে ফিলিস্তিন: মানবাধিকার লঙ্ঘন ও শিকার

গাজার ধ্বংসস্তুপ
 

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত কেবল একটি ভূখণ্ডের দখলের লড়াই নয়—এটি ইতিহাস, ধর্ম, রাজনীতি, আধিপত্য, মানবাধিকার ও জাতিগত অস্তিত্বের জটিল সঙ্কট।

ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের অত্যাচার, অবরোধ ও দমন-পীড়নের পেছনে রয়েছে ঔপনিবেশিক ইতিহাস, সাম্রাজ্যবাদী উত্তরাধিকার, আধুনিক ভূ-রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক নির্লজ্জ নীরবতা।

ইতিহাসের শুরু: ব্রিটিশ উপনিবেশ ও ইসরায়েলের জন্ম


১৯১৭ সালের ব্যালফোর ঘোষণা ছিল সেই প্রথম ধাক্কা, যেখানে ব্রিটিশ সরকার জানায়—তারা ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেন ফিলিস্তিন শাসন করতে থাকে এবং ইহুদি অভিবাসনকে উৎসাহিত করে, যা ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনিদের জমি ও জীবিকা হরণ করে।


১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ প্রস্তাব দেয় ফিলিস্তিনকে দুটি রাষ্ট্রে ভাগ করার—একটি ইহুদি, অন্যটি আরব। কিন্তু ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ৭ লাখ ফিলিস্তিনিকে দেশছাড়া করা হয়, যেটি ইতিহাসে "নাকবা" (বিপর্যয়) নামে পরিচিত।

জমি দখল ও অবৈধ বসতি

১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল পশ্চিম তীর, গাজা ও পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নেয়। এরপর শুরু হয় পরিকল্পিতভাবে ফিলিস্তিনিদের জমি দখল করে সেখানে ইসরায়েলি বসতি গড়ার প্রক্রিয়া।হাজার হাজার ফিলিস্তিনি পরিবার উচ্ছেদ হয়, ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বারবার এসব বসতিকে "অবৈধ" ঘোষণা করলেও ইসরায়েল দখল নীতিতে থেমে থাকেনি।

গাজা অবরোধ ও মানবিক সংকট

২০০৭ সালে হামাস গাজায় ক্ষমতায় আসার পর ইসরায়েল পুরো গাজা স্ট্রিপ অবরুদ্ধ করে দেয়। মিশরও সীমান্ত বন্ধ করে দেয়।ফলে গাজার প্রায় ২০ লাখ মানুষের জীবন হয়ে দাঁড়ায় এক বন্দিশিবিরের মতো। বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ, বিদ্যুৎ, খাদ্য—সবকিছু নিয়ন্ত্রিত।প্রায়ই ইসরায়েল বিমান হামলা চালায়, যাতে শিশু, নারীসহ বহু নিরপরাধ মানুষ নিহত হয়।

দমন-পীড়ন ও অধিকার হরণ

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী নিয়মিতভাবে পশ্চিম তীর ও জেরুজালেমে অভিযান চালায়। ঘর, স্কুল, রাস্তায় শিশু-কিশোরদের পর্যন্ত ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।ফিলিস্তিনিদের চলাচল, শিক্ষা, চিকিৎসা এমনকি পানির অধিকারেও রয়েছে কঠোর সীমাবদ্ধতা।

১৯৪৭ সালের পর থেকে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, এবং এর মধ্যে বহু শিশু এবং বেসামরিক মানুষও নিহত হয়েছে। কিছু প্রধান ঘটনা ও নিহতের সংখ্যা:

১. ১৯৪৮ (নাকবা / বিপর্যয়): ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর, প্রায় ৭ লাখ ফিলিস্তিনি তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। তবে এই সময়ের মধ্যে এবং যুদ্ধ চলাকালীন, হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছিলেন, যদিও নির্দিষ্ট সংখ্যা অজানা, তবে কিছু তথ্য অনুসারে প্রায় ১৩,০০০ ফিলিস্তিনি নিহত হন।

২. ১৯৬৭ (ছয় দিনের যুদ্ধ): ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে, ইসরায়েল পশ্চিম তীর, গাজা, পূর্ব জেরুজালেম এবং গুলান উচ্চভূমি দখল করে নেয়। এই যুদ্ধে প্রায় ২০,০০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়।

৩. ১৯৮৭-১৯৯৩ (প্রথম ইন্তিফাদা): প্রথম ফিলিস্তিনি বিদ্রোহ বা ইন্তিফাদায়, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কঠোর দমন-পীড়ন চালায়। এই সময় প্রায় ১,২০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়, যার মধ্যে অনেক শিশু এবং বেসামরিক ব্যক্তি ছিল।

৪. ২০০০-২০০৫ (দ্বিতীয় ইন্তিফাদা): দ্বিতীয় ইন্তিফাদায়, যা ২০০০ সালে শুরু হয়, প্রায় ৩,০০০ ফিলিস্তিনি নিহত হন এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর হামলায় ১,۰۰০ শিশু মারা যায়।

৫. ২০০৮-২০০৯ (অপারেশন কাস্ট লিড): ২০০৮-২০০৯ সালে গাজার ওপর ইসরায়েলের হামলায় প্রায় ১,৪০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়, এর মধ্যে প্রায় ৩০০ শিশু ছিল।

৬. ২০১৪ (অপারেশন প্রটেকটিভ এজ): গাজায় ২০১৪ সালের যুদ্ধে, প্রায় ২,২০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়, এর মধ্যে ৫৪০ শিশু ছিল।

৭. ২০১৮-২০১৯ (ফ্লোটিলা এবং গাজার সংঘাত): ২০১৮ সালে ফিলিস্তিনিদের গাজার সীমান্তে বিক্ষোভ চলাকালে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী শত শত ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে। প্রায় ১৮০ ফিলিস্তিনি নিহত হয় এবং প্রায় ৩০০ শিশু এই সময় আহত হয়।

৮. ২০২১ (গাজা যুদ্ধ): ২০২১ সালের মে মাসে, গাজার ওপর ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ২৫০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়, এর মধ্যে ৬৬ শিশু ছিল।

৯. ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতে ২০২২, ২০২৩, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালের মধ্যে যেসব সহিংসতা ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, তার কিছু উল্লেখযোগ্য সংখ্যা নীচে দেওয়া হলো:

২০২২ সালে, গাজার উপর ইসরায়েলি হামলায় অনেক মানুষ হতাহত হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়। এর মধ্যে শিশু ও নারী অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর পশ্চিম তীর ও জেরুজালেমে অভিযান চলতে থাকে, যার ফলে বেশ কিছু মানুষ নিহত এবং আহত হন।

নিহত ফিলিস্তিনি: প্রায় ২০০।

আহত ফিলিস্তিনি: হাজার হাজার।

নিহত শিশু: অন্তত ৫০ শিশু।

২০২৩ সালে গাজা, পশ্চিম তীর এবং ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন অঞ্চলে সহিংসতা বেড়ে যায়। এই সময়ের মধ্যে গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলা ও গ্রাউন্ড অপারেশন চলতে থাকে, যার ফলে নিহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ছিল। বিশেষ করে, ২০২৩ সালের এপ্রিল এবং মে মাসে গাজায় ব্যাপক হামলা হয়।

নিহত ফিলিস্তিনি: প্রায় ৩০০ (এই সংখ্যা হালনাগাদ হতে পারে)।

আহত ফিলিস্তিনি: ৩,০০০ এর বেশি।

নিহত শিশু: প্রায় ৬০।

২০২৪ সালেও গাজা এবং পশ্চিম তীর অঞ্চলে সহিংসতা অব্যাহত থাকে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী নিয়মিতভাবে অভিযানে অংশ নেয় এবং অবরোধ অব্যাহত থাকে, যার ফলে মানবিক সংকট তীব্র হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালে গাজায় কিছু বড় আক্রমণ হয়, যার ফলে ফিলিস্তিনির সংখ্যা বাড়ে।

নিহত ফিলিস্তিনি: ১৫০+ (আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী)।

আহত ফিলিস্তিনি: ২,০০০ এর বেশি।

নিহত শিশু: অন্তত ৩০ শিশু।

২০২৫ সাল পর্যন্ত তথ্য এখনও পুরোদমে পরিসংখ্যান করা সম্ভব হয়নি, তবে চলমান সহিংসতা এবং বিক্ষোভের কারণে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী পশ্চিম তীর ও গাজা অঞ্চলে আরও অভিযান চালিয়েছে এবং বহু ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন।

নিহত ফিলিস্তিনি: প্রায় ১০০ এর কাছাকাছি (বর্তমান পরিস্থিতির ভিত্তিতে)।

আহত ফিলিস্তিনি: এখনও অনেক আহত, তবে সংখ্যা নির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন।

নিহত শিশু: ৪৬ শিশু। বেশিও হতে পারে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নীরবতা

ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্র ও কিছু ইউরোপীয় দেশের কাছ থেকে বিপুল অর্থ, অস্ত্র ও কূটনৈতিক সমর্থন পেয়ে থাকে।

প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে দেয় প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা।

এই সমর্থনের কারণেই আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করেও ইসরায়েল বারবার পার পেয়ে যায়।

জাতিসংঘে বহু প্রস্তাব গৃহীত হলেও veto ক্ষমতার কারণে কার্যকর হয় না।

সত্য বলার সাহসই প্রথম প্রতিবাদ

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত এক নিঃশব্দ গণনাট্য, যেখানে ফিলিস্তিনিরা হারাচ্ছে কেবল জমি নয়—তাদের ভবিষ্যৎ, স্বাধীনতা, আর বেঁচে থাকার অধিকার।

ইসরায়েলের দখলদার নীতি, সামরিক দমন, অবরোধ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ গড়ে তোলা সময়ের দাবি।

শান্তির জন্য সবচেয়ে জরুরি—ন্যায়বিচার। আর ন্যায়ের জন্য দরকার সত্যকে দেখা, শোনা, এবং সাহস করে উচ্চারণ করার শক্তি।

নিরপেক্ষতার মুখোশে অন্যায় চাপা পড়ে যাচ্ছে দিনদিন। যখন কেউ বলে “দুই পক্ষই সহিংসতা করছে”, তখন সেটা অনেক সময় একটি দখলদার রাষ্ট্রের সহিংসতাকে বৈধতা দেয় এবং নিপীড়িতের প্রতিরোধকে অপরাধ হিসেবে দাঁড় করায়।

জলন্ত ঘরে পানি না ঢেলে ‘নিরপেক্ষ’ থাকা মানেই আগুনের পক্ষে থাকা। ফিলিস্তিনের শিশুদের যখন হত্যা করা হয়, ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়, তখন কেউ যদি বলে "আমি নিরপেক্ষ", সেটা কার্যত নিপীড়কের পক্ষেই চলে যায়—কারণ ন্যায়ের পক্ষে না দাঁড়ানো মানেই অন্যায়ের ছায়ায় থাকা।


শেষকথা

এই সংঘাতে "নিরপেক্ষ থাকা" খুব কঠিন এবং নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। ইতিহাস, মানবাধিকার এবং বাস্তবতা আমাদেরকে বলে—ফিলিস্তিনিরা নিপীড়িত, তাদের অধিকারের জন্য দাঁড়ানো কোনো পক্ষপাত নয়, বরং ন্যায়ের পক্ষ নেওয়া।


রেফারেন্স:

1. Khalidi, Rashid. The Iron Cage: The Story of the Palestinian Struggle for Statehood. Beacon Press, 2007

2. United Nations Office for the Coordination of Humanitarian Affairs – ocha.org

3. United Nations Security Council Resolution 2334, 2016

4. Human Rights Watch Report on Gaza, 2021 – hrw.org

5. U.S. Congressional Research Service Report, 2023 – fas.org

6. https://www.hrw.org/world-report/2021/country-chapters/israel/palestine

7.OCHA - Occupied Palestinian Territory

8.B'Tselem - Reports

9.UNRWA - Reports on Palestine

10.PCHR - Reports

Comments